ছবি: দৈনিক সীমাহীন
সিরাজগঞ্জ তাড়াশ উপজেলা শস্যভাণ্ডার হিসাবে খ্যাত। সিরাজগঞ্জের নয়টি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধানের আবাদ হয় তাড়াশে। কিন্তু তিন ফসলি উর্বর জমি কেটে পুকুর খনন করার ফলে প্রতি বছর আবাদযোগ্য কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছেন, ২০০৮ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২ হাজার ৫৩৯ টি পুকুর খনন করা হয়েছে। এই এক দশকের বেশি সময়ে আবাদি জমি কমেছে ১ হাজার ৯২০ হেক্টর।
এদিকে তাড়াশ থানার ওসি মো. নজরুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন, ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা লঙ্ঘন করে পুকুর খনন করার অপরাধে জমির মালিকদের বিরুদ্ধে ২০টি মামলা হয়েছে গত ১ মাসে তাড়াশ থানায়। এর মধ্যে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছেন ৮টি। ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তারা করেছেন ১০টি মামলা। ২টি মামলা করেছেন ভুক্তভোগী সাধারণ কৃষকরা বাদী হয়ে।
অপরদিকে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খালিদ হাসান বলেন, পুকুর খননের তথ্য পাওয়া গেলে তৎক্ষণাৎ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদলতে বেশ কয়েকজনকে জেল ও আর্থিক জমিমানা করা হয়েছে। সগুনা ইউনিয়নের খরখড়িয়া গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠের আবাদযোগ্য উর্বর জমি কেটে পুকুর খনন করার অপরাধে ফারুক হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের জেল দেওয়া হয়েছে চলতি মাসের ১ তারিখে। সে জেল খাটছে। নওগাঁ ইউনিয়নের ভায়াট গ্রামে পুকুর খনন করায় ৫ তারিখে সুমন মোল্লা ও সাদ্দাম হোসেনকে ১ মাস করে জেল দেওয়া হয়েছে। এ দুজনও জেল খাটছে। মাধাইনগর ইউনিয়নের পৌষার গ্রামে পুকুর খনন করার অপরাধে শাজাহান নামের এক ব্যক্তিকে ৬ মাসের জেল দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসেই এরকম ৫টি ভ্রাম্যমাণ আদালতে পুকুর খননকারীদের জেল ও জরিমানা দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এই দুই কর্তা ব্যক্তি আরও বলেন, জমির মালিকদের বিরুদ্ধে আদালতের মামলাগুলো বিচারাধীন। তারা সবাই জামিনে রয়েছেন।
নওগাঁ ইউনিয়নের বাঁশ বাড়িয়া গ্রামের ভুক্তভোগী কৃষক কুরমান আলী, তারু আলী, জবান আলী, আবু হানিফ ও কালিদাসনিলি গ্রামের ভুক্তভোগী কৃষক কোরবান আলী, তারিকুল ইসলাম, শাজাহান আলী, আখতার হোসেন বলেন, আমাদের ইউনিয়নের মালিপাড়া গ্রামের সবনম খন্দকার বাবু ওরফে হাজি বাবু বাঁশবাড়িয়া ও কালিদাসনিলি গ্রামের মাঝে বিস্তীর্ণ মাঠের আবাদযোগ্য জমিতে ৪০ থেকে ৪৫ বিঘা আয়তনের ১টি পকুর খনন করছেন এক সাথে তিনটি ভেক্যু মেশিন দিয়ে কেটে। এ পুকুর হয়ে গেলে পুকুরের উত্তর ও দক্ষিণের মাঠের পানি নামতে বাধাপ্রাপ্ত হবে। তখন জমিতে জলাবদ্ধতা দেখা দেবে। আমাদের জমি অনাবাদি পড়ে থাকবে এই পুকুরের কারণে। হাজি বাবু কতিপয় সাধারণ কৃষকদের অতিরিক্ত টাকার লোভ দেখিয়ে চুক্তিভিত্তিক ইজারা নিয়ে পুকুর খনন করছেন।
নওগাঁ ইউনিয়নের সাকোই গ্রামের জহুরুল নামের একজন মাদ্রাসার শিক্ষক বলেন, আমার মাত্র ১০ কাটা জমি ছিল। সলঙ্গা থানার কুমার গাইলজানি গ্রামের সাচ্চু নামের এক পুকুর খননকারী সাকোই গ্রামের মাঠের ১৫ জন কৃষকের জমি ইজারা নেয় পুকুর খননের জন্য। শেষমেষ আমিও দিতে বাধ্য হই। নয়তো আমার ওটুকো জমি পুকুরের এক কোণায় পানিতে তলিয়ে থাকত। ভুক্তভোগী কৃষকরা আরও বলেন, হাজারো কৃষকের জীবন জীবিকার কথা না ভেবে টাকার লোভে পড়ে যত্রতত্র পুকুর খনন করে দিচ্ছেন একটি প্রভাশালী পুকুর খনন চক্র।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খালিদ হাসান আরও বলেন, কারোর একার পক্ষে এই পুকুর খননকারী চক্রকে নিমূল করা সম্ভব নয়। এজন্য তিনি স্থানীয়ভাবে ভুক্তভোগী কৃষকদের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে বলেন। গত সোমবার সাকোই গ্রামের ভুক্তভোগী কৃষকরা রাতে পুকুর খননের সময় সাচ্চুর পুকুরে গিয়ে ভেক্যু মেশিন বন্ধ করে দেয়। এ অপরাধে তাদের আটকে রেখে রাতভর নির্যাতন করেন। পরের দিন দুপুরের দিকে ছেড়ে দেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাঁশবাড়িয়া ও কালিদাসনিলি গ্রামের মাঝের বিলেন বিস্তীর্ণ মাঠের তিন ফসলের উপযোগী জমি কেটে পুকুর খনন করছেন হাজি বাবু। তিনটি ভেক্যু মেশিন দিয়ে তিনি রাতভর পুকুর খননের কাজ করেন। ভায়াট গ্রামের আলামিন নামে একজন পুকুর খননকারী কৃষকের জমি ইজারা নিয়ে পুকুর খনন করছেন ভায়াট মাঠে। লালুয়া মাঝিড়া গ্রামের খোকা হাজি নামে এক ব্যক্তি লালুয়া মাঝিরার উত্তর মাঠে একটি বড় পুকুর খনন করছেন। তবে নওগাঁ ইউনিয়নে ও তাড়াশ সদর ইউনিয়নে অবৈধ পুকুর খনন মহামারি আকারে রূপ নিয়েছে।
পুকুর খননকারী সবনম খন্দকার বাবু ওরফে হাজি বাবু, সাচ্চু, আলামিনসহ আরও অনেকে বলেন, বেশ কয়েক ধরে তাড়াশে পুকুর খনন করা হচ্ছে। তাই আমারও করছি। সবার বন্ধ হলে আমরাও খনন কাজ বন্ধ করে দেব।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, তাড়াশের মাটি বেশ উর্বর। এখানকার বিস্তীর্ণ মাঠের অধিকাংশ কৃষি জমিতে বছরে তিন থেকে চার বার পর্যন্ত বিভিন্ন জাতের ধান ও রবি শস্যের আবাদ হয়। তারপরও কৃষকরা তাদের জমি কেটে পুকুর খনন করে নিচ্ছেন। মূলত মধ্যসত্বভোগী একটি চক্র কৃষকের সব দায়ভার নিয়ে পুকুর খনন করে দিতে উৎসাহী করছেন।
সিরাজগঞ্জ-৩ (তাড়াশ, রায়গঞ্জ, সলঙ্গা) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল আজিজ দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, বৃহস্পতিবার (২২ ফ্রেব্রুয়ারি) সমন্বয় সভা রয়েছে। আমার সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে সমন্বয় সভার আলোচনা শেষে পুকুর বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন